ক্রেতাদের প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীকে তাদের কাছে সহজে প্রাপ্তির ব্যবস্থা করে দিয়ে থাকেন ব্যবসায়ীরা। এ ব্যবস্থা একটি শ্রেষ্ঠতম উপার্জনের পথ একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। কিন্তু সন্দেহটা অন্যখানে তা হচ্ছে ব্যবসায়ীর সততা নিয়ে। ব্যবসায়ীরা যদি সততা না থাকে তাহলে ঐ শ্রেষ্ঠতম পেশাটা হয়ে পড়ে নিকৃষ্টতম উপার্জন। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে এদেশের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এই পবিত্র ব্যবসাটাকে নিকৃষ্টতম পেশায় রূপান্তরিত করতে চলেছে। অথচ আল্লাহ তায়ালা ব্যবসা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনপাকে বলেন, (আহাল্লা লাহুল বাইয়া ওয়াহ হাররামার ব্রেবা) অর্থাৎ আমি ব্যবসাকে তোমাদের জন্য হালাল করেছি এবং সুদকে হারাম করেছি। একজন সৎ ব্যবসায়ীর প্রথমে উচিত তার পণ্যের গুণগতমান কোন একার গোপন না করা কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ ব্যবসায়ীরা তা করেন না। বরং খারাপগুলো ঢেকে রেখে সেন । আমাদের দেশে আজ সততার বড় অভাব। কাপড়ের দোকান থেকে শুরু করে মাছের দোকান পর্যন্ত সকল জায়গায় ক্রেতারা প্রতারিত খারাপ মালগুলোকে নীচে দিয়ে ভালো মানগুলোকে খারাপের উপর দিয়ে ক্রেতাকে প্রতারিত করছে।
ওজন কম দেয়া বিশেষ করে সাধারণ ব্যবসায়ীদের চরিত্রে রূপ লাভ করেছে। মাছ, মাংস থেকে শুরু করে কোন পণ্যের সঠিক পরিমাণ খুঁজে পাওয়া ক্রেতার জন্য সুন্দর । অনন্ত বিক্রির সময় বিক্রেতা, ক্রেতাকে দেখিয়ে ও সঠিক পরিমাপ করে দিবে। কিন্তু হাতের কারসাজিতে ক্রেতাকে বোকা বানিয়ে ছাড়বে। মাপে কম দেওয়া সম্পর্কে পরিতাপ আল্লাহ্ তায়ালা وَيْلٌ لِّلْمُطَفِّفِينَ-الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ-وَإِذَا كَالُوهُمْ أَو وَّزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ পরিমাপকারীদের জন্য যারা লোকের কাছ থেকে পরিমাপে পুরোপুরিই গ্রহণ করে। কিন্তু তাদেরকে দেয়ার সময় পরিমাপে কম দেয় (সূরা মুতাফফেফিন-১-৩) বর্তমান বাংলাদেশে সকল পণ্যে ভেজাল, ভেজালহীন পণ্য রূপকথার মতো। আটায় ভেজাল, চালে ভেজাল, ডালে, ভেজাল, লবণে ভেজাল, তেলে ভেজাল, গোস্তে ভেজাল, ভেজাল ছাড়া কোন পণ্যের কল্পণা করা যায় না। ঢাকার শহরের এমন কিছু মার্কেট আছে সেখানে গেলে কোন পণ্য শুধু দেখলে না কিনলেও অপমান হতে হয় আবার একবার যদি দাম বলা হয় তো অবশ্যই নিতে হবে। অথচ ব্যবসার মাধ্যমে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে আন্তরিকতা ও সোহার্দ্যপূর্ণ ভালবাসা হওয়ার পরিবর্তে তিক্ততা লক্ষ্য করা যায়। আল্লাহর রসূল সা: কে উপার্জন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি তাঁর উত্তরে বলেছিলেন মানুষের যাবতীয় উপার্জনের মধ্যে সবচেয়ে পবিত্র হলো মানুষ নিজ হাতে যা কামাই এবং হালাল ব্যবসার মাধ্যমে যা উপার্জন করে হযরত রাফে ইবনে খাদিজা (রাঃ) হতে হাদীসটি বর্ণিত (তিরমিযী)।
প্রতিদিন প্রতিনিয়ত ব্যবসায়ীরা ক্রেতাকে মিথ্যা কথা বলে প্রতারিত করছে। বিভিন্ন প্রক্রিয়ার বিক্রেতা ছল-চাতুরীর আশ্রয় নিয়ে থাকেন। যেমন ধরুন একটা সার্ট বিক্রেতার কিনা ১২০ টাকায় কিন্তু ক্রেতা দাম জিজ্ঞাসা না করলেও বিক্রেতা অত্যন্ত ভাল মানুষ সেজে নিজের থেকে বলে এটি তার ৫০০ টাকায় কেনা ৫৫০ টাকা দিলে তার মাত্র ৫০ টাকা লাভ। অনেক সরলমনা ক্রেতা এ ধরনের বিক্রেতার কথায় বিশ্বাস করে ৫০ টাকা লাভ দিয়ে কিনে নিয়ে যায়। তখন অবশ্যই উভয়ই মিট মিট করে হাসে। ক্রেতা হাসে মাত্র ৫০ টাকা লাভ দিয়ে কিনলাম। অন্যদিকে বিক্রেতা হাসে ১২০ টাকার জিনিস ৫৫০ টাকায় বিক্রি করলাম। পার্থক্য কতটুকু পাঠক মহল ভেবে দেখুন।
আমাদের দেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উপলক্ষে মূল্য হ্রাস ঘোষণা করে ব্যবসায়ীরা যা কিনা অসততারই নামান্তর বলে আমি মনে করি। এর মধ্যে প্রতারিত করা হচ্ছে ক্রেতাদেরকে এরা কিছু উদ্দেশ্য সামনে রেখে মূলত এ সমস্ত ঘোষণা দিয়ে থাকেন। যেমন- নিকৃষ্ট বা বাতিল মাল বিক্রির আসায় অথবা যে সমস্ত পণ্য বাজারে চলে না বা ক্রেতারা কিনে না, সেই সব অচল মাল বিক্রি করার জন্য। এছাড়াও মূল্যের গোলক ধা-ধায় ক্রেতারা প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন। অথচ আল্লাহ তায়ালা পবিত্র। কুরআনপাকে বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَارَةً عَن تَرَاضٍ مِّنكُمْ ۚ وَلَا تَقْتُلُوا أَنفُسَكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا হে ঈমানদারগণ তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। কেবলমাত্র তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ক্রয় বিক্রয় করা হয় তা বৈধ (সূরা নিসা-২৯) ব্যবসায় অসাধুতা অবলম্বন করা আর অন্যের সম্পদ গ্রাস করা একই কথা।
কিন্তু আজ ব্যবসা নামক এই মহৎ পেশা শুধুমাত্র অসাধুতার কারণে পরিণত হয়েছে নিকৃষ্টতম পেশায়। ব্যবসার দ্বারায় ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষের যেখানে শাস্তি আর সমৃদ্ধি ঘটাবে সেখানে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীর দ্বারা বাড়ছে জনগণের দুর্ভোগ এ ধরনের ব্যবসায়ী কখনই সমাজ তথা জনগণের কল্যাণকামী হতে পারে না বরং ওদের দ্বারায় উল্টোটা ঘটবে। আর শুধুমাত্র আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এদের চারিত্রিক সংশোধন সম্ভব নয় বরং যেটি সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন। তা হলো আল্লাহ প্রদত্ত বিধান মানা এবং তাদের মধ্যে নাগরিক চেতনা সৃষ্টির মাধ্যমে মানসিক পরিবর্তন আনতে হবে। আর এ পরিবর্তন যদি তাদের মধ্যে জাগ্রত হয় তাহলে দেশ, সমাজ, জাতির মঙ্গল বয়ে আনতে এরা সক্ষম। অন্যথায় তারা দেশ, সমাজ ও জনগণের অপবাদ নিয়ে তাদের বেঁচে থাকতে হবে।

.jpg)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন