আমরা সব সময় বলে থাকি আমরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। গণতন্ত্রের শর্ত হলো সকল মত ও পথের মানুষের কথা শোনা, বোঝা ও মতের অমিল থাকলেও তার সম্মান ও মর্যাদা দেয়া এবং সকল ধর্মের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা। আমাদের দেশে সেই অর্থে ধর্মনিরপেক্ষতার পূর্নভাবে অর্জিত হয়েছে বলে আমরা বিশ্বাস করি। তবে, বিগত ফ্যাসিষ্টদের আমলে অতীতের সকল অর্জনকে ম্লান করে দিয়েছিল। আমার দেশে এখন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পূর্ণভাবে বিরাজমান।
পহেলা বৈশাখ পালিত হবে কি ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে, নাকি ধর্মের ভিত্তিতে নাকি মাতৃভাষার ভিত্তিতে।
আমাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ঘোষণা করেছিল তারা ধর্মযুদ্ধে নেমেছে- আসলে কি তাই। মোটেই না। আমরা তখন বলেছিলাম আমরা আমাদের মাতৃভূমির মুক্তির সংগ্রামে নেমেছি। পাকিস্তানীদের শোষণ বঞ্চনার প্রতিকার করে গণতান্ত্রিক ও একটি মানবিক মুল্যবোধ সমৃদ্ধ জাতি প্রতিষ্ঠার লক্ষেই আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। সকল পরাশক্তির রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ৭১ র মুক্তি সংগ্রম শুরু হয়।
বাংলাদেশ কেন ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতান্ত্রিত ও মানবিক মুল্যবোধ সমৃদ্ধ জাতি প্রতিষ্ঠার করতে পারলো না? এর কারণ নেতৃত্ব। তাই তো সাধারণ মানুষ এখন ন্যায়বিচার এর আশা ভরসা করে ধর্মের কাছে। কারণ প্রচলিত রাষ্ট্র ব্যবস্হা ও সমাজের কাছে মানুষ অন্যায়-অত্যাচার, জুলুম-নির্যাতনের প্রতিকার পায়নি। যে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় মানুষ পুলিশকে চোর-ডাকাত এর চেয়ে বেশি ভয় পায়,
দেশের আইন-আদালতের উপর ন্যূনতম আস্তা ও বিশ্বাস নাই।
বিগত সময়ে বৈশাখ পালিত হয়েছে রাজনৈতিক নেতা নেত্রীর চরিত্র হনন ও অসম্মানিত করার জন্য। বৈশাখের যে লোকায়িত সৌন্দর্য তা ছিল না। ব্যবসায়ীদের হাল খাতা করা ও কাপড়ে ঘেরা রুমে মিষ্টি খাওয়া না করে জিব জন্ত্রু আর মুখোশ পরে এবং বিভিন্ন রংবেরঙের শাড়ি পড়ে বেহায়াপনার উন্মুক্তা চড়ানো ছাড়া আর কিছুই ছিল না।
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হয় ধর্ম ও জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। দেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবি ও ভারতীয় আশির্বাদপুষ্ট দালাল ও ভারতের উছিষ্ট্যভোগী কিছু পরগাছা ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে ধর্মহীনতা বলে।
৪৭ দেশভাগ, ৫২ ভাষা আন্দোলন, ৬৬ ছয় দফা ৬৯ গণঅভ্যুত্থান, ৭০ নির্বাচন এবং ৭১ স্বাধীনতা সংগ্রাম কোনটিতে ধর্মনিরপেক্ষতার লেশমাত্র ছিল না। এটা স্পষ্ট ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্ন একেবারেই অবান্তর।
ধর্মনিরপেক্ষতা মানে সকল ধর্মের মানুষ সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। যেমন, রাষ্ট্রীয়ভাবে সকল ধর্মের মানুষ তার নিজ নিজ ধর্ম কর্মের অধিক চর্চা করতে পারা।
স্বাধীনতার কৃতিত্ব যখন একপক্ষীয় কুক্ষিগত করে আওয়ামী লীগ তখন থেকে রাষ্ট্র যেভাবে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক থাকার কথা ছিল তা বুলুন্ঠিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় এসেছে তখনই রাষ্ট্রের সকল গণতান্ত্রিক ও সংস্কৃতিক কাঠামো ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছে।
এই জনপদে বাংলা ভাষা আর সংস্কৃতির বিকাশ হইছে মুসলিম শাসকদের হাত ধরে। পয়লা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ আমাদের বাঙালি বা বাংলাভাষী হিসেবে যে আত্মপরিচয় সেইটা আমাদের মুসলিম আত্মপরিচয়ের সাথে সামঞ্জস্য। আমাদের লোকসংস্কৃতিতে বা ইসলামের সাথে যেইটুকু মিলবে না, সেইটুকু বাদ দিয়ে আমরা বাকিটুকু নিব এবং সেটাই আমাদের বাংলা সংস্কৃতি।
বাংলাদেশের ৯২ শতাংশ মুসলিম, আমাদের গর্বিত সংস্কৃতি আছে। হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতি আমরা নিতে পারি না। অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে আমাদেরকে বিজাতীয় সংস্কৃতি গত ৫৪ বছর উদগিরণ করতে হয়েছে।
আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কেনা বেচার মাধ্যমে গোটা জাতিকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে।
বলা হচ্ছে পয়লা বৈশাখ ধর্মের ভিত্তিতে নয়, ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে পালন করা হয়। যদি তাই হয় তাহলে আমরা কেন দেখবো কুকুরের মাথায় টুপি, কিংবা ধর্মীয় ব্যক্তিদের হিংস্র পতি মুর্তি। তার মানে পহেলা বৈশাখ পালন করা হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে নয় বরং ধর্মকে ব্যঙ্গাত্বক ও অবমাননাকর ভাবে। পহেলা বৈশাখের সাথে নারী তার ব্লাইজ ছাড়া শাড়ি পরা এবং পৃষ্টদেশ উন্মুক্ত রাখার সাথে পহেলা বৈশাখের কি সম্পর্ক? বরং মিডিয়ার বদোলতে আমরা জানতে পারি তাদের সহকর্মী দ্বারাই তারা যৌন হয়রানির শিকার।
পহেলা বৈশাখ পালনের মাধ্যমে মানুষে মানুষে ঐকা গড়েতে দেখা যায়নি। বরং বৈষম্যের ক্ষত আরও গভীর ও প্রশস্ত হয়েছে। দেশে ধনীর সংখ্যা ও তাদের সম্পদ বাড়ছে। এতে গরিব আরও গরিব হচ্ছে। দেশ স্বাধীন হয়েছে ৫৪ বছর। বেশ কুয়েকটি নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু আমরা প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছি। এর কারণ হচ্ছে বৈষম্য।
জুলাই গণ অভ্যাত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিষ্ট হাসিনার পলায়নের পর পয়লা বৈশাখ আমাদের কাছে প্রকৃত গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা ও মূল্যবোধ, সুশাসন, ন্যায়বিচার, নিরেট দেশপ্রেম ও ইসলামী মুল্যবোধের নিশ্চয়তা চায়।
পহেলা বৈশাখের সত্যিকারের আনন্দ উপভোগ করুক জাতি এই প্রত্যাশা করছি।
সকলকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা।



কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন