জীবনের সংগ্রাম সাধনায় এবং সভ্যতা ও সংস্কৃতি নির্মাণে নারী ও পুরুষের উভয় চিরকালই পরস্পরের সহযোগী ও সাহার্যকারী হয়ে রয়েছে, উভয়েরই সম্মিলিত চেষ্টা প্রচেষ্টার ফলেই সাধিত হয়েছে সমাজ ও সভ্যতার বিকাশ এবং উন্নয়ণ। সমাজে ভাঙ্গা-গড়ার, উন্নতি-অবনতি ও কল্যাণ অকল্যাণের সাথে নারী ও পুরুষের সকলেই নিবিড় অবিভিন্ন সম্পর্ক বিদ্যমান। তাই নারী সমাজকে বাদ দিয়ে মান জাতির জন্যে যেকোন পরিকল্পনাই রচিত হোক না কেন তা অনিবার্যভাবে হবে অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ। সামষ্টিক জীবনের সুষ্ঠুতা ও জাতি একান্তভাবে নির্ভর করে নারী-পুরুষের মাঝে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় সম্পর্ক যথার্থ হওয়ার উপর। নারীর চেষ্টা আঘামায় যে ত্রুটি ও অসম্পূর্ণ থেকে যাবে পুরুষ তা কানায় কানায় পূর্ণ করে দিবে। অন্যদিকে ত্রুটি বিচ্যুতি ও অপূর্ণতা থাকবে পুরুষের দায়িত্ব পালনে তার পরিপূরণে এগিয়ে আসবে নারী।
সমাজের কোন ক্ষতি হলে তা থেকে নারীরা যেমন বেঁচে থাকতে পারে না। আবার সমাজে কল্যাণ সাধিত হলে তার সুফ নারী সমাজ ও সমানভাবে ভোগ করবে। এমতবস্থায় নারীরা সমাজের কল্যাণ সাধনের ক্ষেত্রে কিছুতেই দূরে থাকতে পারে না। নারী সমাজকে দিয়ে আজ অতি মাত্রায় ব্যস্ত কেউ কেউ। আবার কেউ তাদের সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন। কেউবা আবার তাদেরকে নির্দিষ্ট গন্ডি থেকে টেনে বাইরে আনতে চায়।
মুক্তি মানুষের সহজাত কামা। প্রত্যেক মানুষই চায় স্বাধীন সত্ত্বা নিয়ে বাঁচতে। এই পথে বাধা দিয়ে কেউ কাউকে টেকিয়ে রাখতে পারে না। পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণে বাইরের জগতে পুরুষের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে অথবা অর্থনৈতিক স্বাধীনতা লাভ করলেই কি সে পাবে সঠিক মুক্তি ? আধুনিক নারী সমাজ ও সব প্রশ্নের একটা বিজ্ঞান ভিত্তিক উত্তর কামনা করে। সামাজিক জীবনে নারী পুরষের সম্পর্কের ধরণটা কেমন হবে? তাদের কাজের ক্ষেত্রই বা কি এটা একটা মৌলিক প্রশ্ন এর উপরই নির্ভর করে গোটা সমাজ ও সভ্যতার শান্তি, শৃঙ্খলা। একথা সন্দেহাতীতভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, মেয়েদের প্রকৃত স্থান এবং আসল কর্মক্ষেত্র হচ্ছে তাদের ঘর।তাদের স্বাভাবিক দায়িত্ব ও ঠিক তাই। ঠিক এ কারণেই মহিলাদের উপর বাইরের সামাজিক ও সামগ্রিক পর্যায়ের কোন কাজের দায়িত্ব অর্পন করা হয় নি।
এজন্য ইসলামী শরিয়তে মেয়েদের উপর ঠিক সে ধরনের কাজেরই দায়িত্ব দিয়েছে যা তাদের ছাড়া আর কারোর করার সাধ্য নেই। সে কাজ তারা যেন অষন্ড নির্লিপ্ততা ও নিষ্টাপূর্ণ মনোযোগ সহকারে সম্পন্ন করতে পারে। ইসলাম সে ধরনের সমাজ কাঠামে পেশ করছে। নারী এবং পুরুষের অবাধ মেলা মেশার সুযোগ করে দেয়ার পর নৈতিক চরিত্রের পবিত্রতা রক্ষা করা নিজস্ব পারিবারিক জীবনের স্থিতি রক্ষা করে চলা কারোর পক্ষেই সম্ভব হতে পারে না। না ইউরোপ আমেরিকা তা সম্ভব হয়েছে না সম্ভব হচ্ছে। বর্তমানের এশিয়া আফ্রিকায় এ ধরনের সমাজে কেবল নৈতিক বিপর্যয়ই পুঞ্জিভূত হয়ে উঠেনি, সুষ্ঠুভাবে গঠিত এবং সম্প্রীতি ও বাৎসল্যপূর্ণ পারিবারিক জীবনও ভেঙ্গে চুরমান হয়ে গেছে এরই ফলে সমাজ ও সভ্যতায় নেমে এসেছে বিপর্যয়।
পারিবারিক জীবনের প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ দু'টো, একটি হচ্ছে পরিবারের অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরণ, আর অপরটি হচ্ছে মানব বংশের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। এখানে দ্বিতীয় কাজটি যে নারীকেই করতে হয় এবং এ ব্যাপারে পুরুষের করণীয় খুবই সামান্য আর তাতে কষ্টও কিছু নেই, আছে আনন্দ, সুখ, স্ফূর্তি। তাহলে যে নারী মাবন বংশের ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্যে এতো দুঃখ, কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছে তাকেই কেন আবার অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরণের দায়িত্ব বহন করতে হবে। এটা কোন ধরনের ইনসাফ। ইসলাম এ ধরনের বেইনসাফী করতে রাখী নয়। তাই ইসলামের পারিবারিক ব্যবস্থায় গোটা পরিবারের অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরণের দায়িত্ব একমাত্র পুরুষের। দু'টো কাজ দু'জনের মধ্যে স্বাভাবিক নিয়মে বন্টিত হয়ে আছে। ইসলাম সে স্বাভাবিক ঘটনকেই মেনে নিয়েছে। শুধু মেনে নেয়নি, এ বণ্টনকে স্বাভাবিক কটন হিসেবে স্বীকার করে দেয়াই বিশ্ব মানবতার চির কল্যাণ নিহিত বলে ঘোষণাও করেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে নারী মহাসম্মানিত মানুষ, তাদের নারীত্ব হচ্ছে সবচেয়ে মূল্যবান সব চেয়ে সম্মানাহ। আল্লাহ তায়ালা তাদের এ সম্মান মর্যাদা নিহিত রেখেছেন তাদের কাছে অর্পিত বিশেষ আমানতকে সঠিকভাবে রক্ষার জন্য। এতেই তাদের কল্যাণ মানে গোটা মানবতার কল্যাণ ও সৌভাগ্য।
বস্তুত বিশ্ব মানবতার বৃহত্তম কল্যাণ ও খেদমতের কাজ নারী নিজ গৃহাভ্যন্তর থেকেই সম্পন্ন করতে পারে। স্বামীর সুখ, খর অকৃত্রিম সাথী হওয়া স্বামীর হতাশাগ্রস্থ হৃদয়কে আশা আকাংখ্যায় ভরে দেয়া এবং ভবিষ্যৎ সমাজকে সুষ্ঠুরূপে গড়ে তোলার কাজে একজন নারীর পক্ষে ও ঘরের মধ্যে অবস্থান করেই সম্ভব। আর প্রকৃত বিচারে এই হচ্ছে নারীর সব চাইতে বড় কাজ। এতে না আছে কোন অসম্মান না আছে কোন লজ্জা ও লাঞ্ছনার ব্যাপার। তাই ইসলাম নারীর উপর অর্থোপার্জনের দায়িত্ব দেয়নি। দেয়নি পরিবারের ভরণ পোষণের দায়িত্ব। তারপরও যদি নারী ঘর থেকে বাহির হয়ে আসে তাহলে বুঝতে হবে তার শুধু রুচি বিকৃতি হয়নি তার মানসিক বিপর্যয় Mental disorders ও সৃষ্টি হয়েছে, সুস্থ্য মানসিকতা থেকেও সে বঞ্চিতা।
সমাজ ও সভ্যতার উৎকর্ষ সাধানের জন্য নারী ও পুরুষের উপর দায়িত্ব অর্পিত হয়। স্বামী-স্ত্রী মিলনের ফলে যে, সন্তান গর্ভে আসে তখন স্বামী ও স্ত্রীর উপর এক নবতর দায়িত্ব অর্পিত হয়। তখন স্ত্রীর দায়িত্ব এমনভাবে জীবনযাপন, দিন, রাত অতিবাহিত করা যাতে করে গর্ভস্থ সন্তান সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে। বেড়ে উঠার ব্যাপার কোনরূপ বিঘ্নের সৃষ্টি না হয় এবং কর্তব্য হচ্ছে এমন সব কাজ ও চাল-চলন থেকে বিরত থাকা, যার ফলে সন্তানের নৈতিকতার ওপর দুষ্ট প্রভাব পড়তে না পারে। গর্ভে সন্তান সঞ্চার হওয়ার পর মায়ের কর্তব্য স্বীয় স্বাস্থ্য এবং মন উভয়কেই যথাসাধ্য সুস্থ্য রাখতে চেষ্টা করা। কেননা গর্ভস্থ সন্ধানের শরীর গঠন ও বাড়তির উপর তার মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে দৌড়া-দৌড়ি, লাফা-লাফি, নৰ্তন-কুর্দন ও ভ্রূণের পক্ষে বড়ই ক্ষতিকর। শুধু তাই নয় গর্ভবতী নারীর চাল- চলন, চিন্তা-বিশ্বাস, গতিবিধি ও চরিত্রের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে গর্ভস্থ সন্তানের মন ও চরিত্রের উপর। এ সময় মা যদি নির্লজ্জভাবে চলা-ফেরা করে, করে কোন লজ্জাকর কাজ, তবে তার গর্ভস্থ সন্তান ও অনুরূপ নির্লজ্জ ও চরিত্রহীন হয়ে গড়ে ওঠবে, এতে সমাজ ও সভ্যতায় দেখা দিবে অস্থিরতা।
পক্ষান্তরে এ সময় মা যদি অত্যন্ত চরিত্রবর্তী নারী হিসেবে শালীনতার সব নিয়ম-কানুন মেনে চলে তার মন-মগজ যদি এ সময় পূর্ণভাবে ভরে থাকে আল্লাহর বিশ্বাস পরকালের ভয় এবং চরিত্রের দায়িত্বপূর্ণ অনুভূতিতে তখন সন্তান ও তার জীবনে অনুরূপ দায়িত্ব জ্ঞান সম্পন্ন চরিত্রবান ও আল্লাহর অনুগত হয়ে গড়ে ওঠে, ফলে সমাজ ও সভ্যতার উৎকর্ষ সাধিত হয়। আজ আমাদের সমাজ ব্যবস্থা ও পারিবারিক জীবন বিপর্যন্ত। অথচ মুসলিম সমাজ ও পরিবার এক সময় ছিল এক একটি দূর্গ। তখনকার সমাজ ব্যবস্থায় প্রেম, ভালবাসা, দেহ, মায়া-মমতা এবং পরম শান্তি ও স্বস্থির কেন্দ্র বিন্দু ছিল। সে শুভ ও কল্যাণময় অবস্থা ফিরিয়ে আনা একান্ত অপরিহার্য।


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন